আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম ও এর উপকারিতা

Food Habit Health and Body

আপেল আমাদের সুপরিচিত একটি ফল। আর এই আপেল থেকে উৎপাদিত আপেল সিডার ভিনেগার একটি জনপ্রিয় পানীয়। ঘরে সহজেই এটি বানানো যায় বলে এটি দারুণ একটি ঘরোয়া পানীয় বর্তমানে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা কিংবা রান্নাবান্নায় এটির ব্যবহার বেশ পুরনো। নিয়ম মাফিক এই পানীয় খেতে পারলে দেহের অনেক উপকার হয়। দেহের নানাবিধ এ সকল উপকার ও আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম এসব সম্পর্কেই আজ জানবো।

আপেল সিডার ভিনেগার আসলে কি?

অন্য সাধারণ ভিনেগারের মতো এক প্রকার ভিনেগার হল আপেল সিডার ভিনেগার। এটি মূলত আপেলের সিডার থেকে তৈরি হয়। আপেলের সিডারের ফার্মান্টেশন থেকে এই ভিনেগার প্রস্তুত হয়। অন্য ভিনেগারের মতো ৫% অ্যাসিডিটি রেখেই এটি প্রস্তুত করা হয়।

আপেল সিডার ভিনেগার এর উপকারিতা

আপেল সিডার ভিনেগারের রয়েছে অনেক উপকারিতা। এর উপকার বলে শেষ করা যাবে না। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এর উপকারিতা এখনও চলমান। প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় ক্ষতস্থান নিরাময়ের জন্য এটি ব্যবহার করা হতো। পাশাপাশি অন্য অনেক রোগের ওষুধ হিসেবেও এটির ব্যবহার ছিলো।

বর্তমানেও এই পানীয় বা ভিনেগার নানা প্রকার উপকারে লাগে। এর উপকারিতা সম্পর্কে আজ জানবো।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে

টাইপ টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আপেল সিডার ভিনেগারের রয়েছে অসাধারণ উপকারিতা। অনেকেই হয়তো এটি জানেন না। কিন্তু এটিই সত্যি যে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এই ভিনেগারের রয়েছে দারুণ ভূমিকা।

টাইপ টু ডায়াবেটিস হলে রোগীর দেহে ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়। রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে দেহে নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা দেখা দেয়। আর এক্ষেত্রে সমাধান হতে এই আপেল সিডার। এটি দেহের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ইনসুলিনের পরিমাণও বাড়ায়।

কিছু গবেষণার মতে, ডায়াবেটিস রোগীরা ঘুমের আগে ২ চামচ আপেল সিডার ভিনেগার খেলে তা ৪% পর্যন্ত শর্করার হার কমাতে সক্ষম। তবে যে ভিনেগারই খান না কেন তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া উচিৎ।

ওজন নিয়ন্ত্রণে ও ওজন কমাতে

এই ভিনেগারের দেহে মেটাবলিজম বুস্ট করে। আর এর ফলে সহজে ক্ষুধা লাগে না। আর ক্ষুধা না লাগলে অন্য খাবার খাওয়ার ইচ্ছাও জাগে না। এতে করে ওজন কমে।

পাশাপাশি ডায়েট চার্টে এই ভিনেগার রাখলে পাবেন উপকারিতা। কারণ এই ভিনেগার দেহের অতিরিক্ত মেদ ঝড়াতে সক্ষম।

হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায়

চিকিৎসকদের মতে, কারো দেহে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে নিয়মিত এই ভিনেগার খেলে তা ঠিক হয় যায়। কতিপয় গবেষণায়ও এটি প্রমাণ হয়েছে।

তাই চিকিৎসকরা হরমোনের সমস্যায় এই আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি এই ভিনেগার মেয়েদের নিয়মিত পিরিয়ড ঠিক রাখতেও সহায়তা করে।

আপেল সিডার ভিনেগার ও আপেল।

হৃৎপিন্ড সুস্থ রাখে

প্রতিদিন নিয়ম করে এই ভিনেগার খেলে হৃৎপিন্ডের কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে করে হৃৎপিন্ড সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকে এবং হৃদরোগও কম হয়।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে

কিডনি থেকে উৎপাদিত রেনিন নামক একটি হরমোনের কারণে আমাদের দেহের রক্তনালী সমূহের সংকোচন প্রসারণ বেড়ে যায়। এতে করে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আর এই ক্ষেত্রে এই ভিনেগার এই রেনিনের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে দেহের রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

হজমশক্তি বাড়ায়

এই ভিনেগার আমাদের হজমশক্তি বাড়ায়। এটি দেহের পাকস্থলীর এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে পেপসিন এনজাইম তৈরির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে সহজেই খাদ্য হজম হয়।

ক্যান্সার প্রতিরোধে

অন্য যেকোনো ভিনেগারের মতোই এই ভিনেগারও ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে থাকে। তাই নিয়মিত এই ভিনেগার খেতে পারেন। এতে আপনার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমবে।

ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে

আপেল সিডার ভিনেগার খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে বেশ কার্যকর একটি উপাদান। এই ভিনেগার E.coli এর মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম। তাই অন্য ভিনেগারের মতোই খাদ্য সংরক্ষণে এই ভিনেগারও ব্যবহার করা যায়।

ঠান্ডা ও সর্দি-কাশিতে

ঠান্ডা লাগলে বা কাশি কিংবা সর্দি হলে গরম জলের সাথে আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে ভাপ নিলে বা খেলে উপকার পাওয়া যায়। পাশাপাশি এই টোটকা গলাব্যথায়ও অনেক আরাম দেয় ও উপকার করে।

ত্বকের সুরক্ষায়

প্রাচীন কাল থেকেই ত্বকের সুরক্ষায় একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল এই ভিনেগার। এই ভিনেগারে থাকা অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান দেহের ত্বকের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এই মাইক্রোবিয়াল উপাদান ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখে ও ত্বকের pH মান ঠিক রাখে।

পাশাপাশি ব্রণের সমস্যা দূর করতেও অনেকে এটি ব্যবহার করে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবেই সরাসরি ত্বকে এটি ব্যবহার করা উচিৎ। অন্যথায় ত্বক জ্বলে যাওয়ার মতো সমস্যার দেখা দিতে পারে।

চুলের যত্নে

অনেক ডার্মাটোলজিস্টের মতে, এই ভিনেগার চুলের খুশকি কমায়। এছাড়াও পানিতে মিশিয়ে এই ভিনেগার মাথায় দিলে সুন্দর চুল পাওয়া যায়। পাশাপাশি চুল মজবুত হয় ও ঔজ্জ্বল্যতা বৃদ্ধি পায়।

মুখের দুর্গন্ধ কমাতে

মুখের দুর্গন্ধ একটি মারাত্মক সমস্যা। এই সমস্যা অনেক সময় মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অনেকে মাউথওয়াশ ব্যবহার করে থাকেন।

তবে মাউথওয়াশের বিকল্প হিসেবে আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করা যায়। এই ভিনেগার মুখের দুর্গন্ধ দূর করার সাথে সাথে দাঁত ও মাড়িও মজবুত করে।

এছাড়াও রান্নাবান্নার কাজে চাইলে এই ভিনেগার ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন রান্নায় উপকরণ হিসেবে এই ভিনেগারের ব্যবহার রয়েছে। আবার কেউ চাইলে পানিতে এই ভিনেগার মিশিয়ে শাকসবজি ও ফলমূল ধুয়ে নিতে পারেন। এটি রাসায়নিক কোনো উপাদান দিয়ে খাদ্য উপাদান ধৌত করার চেয়ে ভালো।

আপেল সিডার ভিনেগার
আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার রয়েছে উপকারিতা।

আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম

আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার তেমন কোনো নিয়ম নেই। তবে কুসুম গরম পানির সাথে ২-৩ চামচ ভিনেগার মিশিয়ে খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়।

এছাড়াও রান্নায় কিংবা সালাদের সাথে বা অন্য কোনো খাবারের সাথে মিশিয়েও খেতে পারেন এই ভিনেগার। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন এই ভিনেগার খাওয়া ভালো।

আপেল সিডার ভিনেগারের অপকারিতা

অপকারিতা না বলে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বলাই হয়তো ভালো। অন্য পানীয় বা ভিনেগারের মতো এই ভিনেগারেরও রয়েছে কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। জেনে নিই সেগুলো।

  • দীর্ঘদিন এই ভিনেগার ব্যবহারে শরীরে দেখা দিতে পারে পটাশিয়ামের ঘাটতি
  • এই ভিনেগার অতিরিক্ত ব্যবহারে রয়েছে হাঁড় ক্ষয় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।
  • বেশি পরিমাণে এই ভিনেগার ব্যবহার করলে দাঁতের এনামের ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি অন্য অভ্যন্তরীণ ক্ষতিও হতে পারে।
  • এই ভিনেগার হজমশক্তি বাড়ালেও আলসার বা অ্যাসিডিটির রোগীরা এই ভিনেগার এড়িয়ে চলাই ভালো।
  • আপেল সিডার ভিনেগার ত্বকে সরাসরি ব্যবহারে জ্বালাপোড়া হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করা উচিৎ।

পরিশেষে

কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বাদ দিলে আপেল সিডার ভিনেগার কিন্তু খুবই উপকারী একটি পানীয়। নিয়মিত এটি খেতে পারলে আখেরে লাভ আপনারই।

তাই নিয়ম করে প্রতিদিন এই ভিনেগার খাওয়ার চেষ্টা করুন। আর চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খেলে বা ব্যবহার করলে এর ক্ষতিকর দিক কিংবা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলা অবশ্যই সম্ভব।

আরও পড়ুন

কলা খেলে কি কি উপকার পাবেন?
ইলিশ মাছের পুষ্টিগুণ কি?
রসুনের উপকারিতা কি কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

All Rights Reserved By Healthjus © 2021-2022