নিম পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা

General Queries

আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা কয়েক হাজার বছর ধরে নিম পাতার গুণাগুণ সম্পর্কে বলে এসেছেন। নিম গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে “AZADIRACHTA INDICA” যা একটি ঔষধি গুণসম্পন্ন বহুবর্ষজীবী ও চিরহরিৎ বৃক্ষ। ভেষজ চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটির বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এটি এমন একটি গাছ যার কোনোকিছুই নষ্ট হয়না, এটির ছাল থেকে শুরু করে ডাল সবকিছুই নানাভাবে ব্যবহার করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার বছর আগে থেকে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে  নিমপাতার ব্যবহার হয়ে আসছে। নিমগাছে প্রায় ১৩০টি ঔষধি গুণ রয়েছে। এটি গ্রহণ করলে শরীরে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল, অ্যান্টি-মাইক্রাবিয়াল এবং অ্যান্টি-ভাইরাল প্রপাটিজের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

নিম পাতার উপকারিতা

নিমগাছকে অনেকে বন্ধু বৃক্ষ নামেও ডেকে থাকেন এর নানাবিধ ব্যবহারের জন্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে একে “একুশ শতকের বৃক্ষ” বলে ঘোষণা করেছে। বাসায় একটি নিমগাছ থাকার অর্থ হলো বাসায় একজন ডাক্তার থাকা। নীচে নিমপাতার বহুমুখী উপকারিতা তুলে ধরা হলো:

খুশকি দূর করবে নিম

খুশকি সবসময় সর্বদা যন্ত্রণাদায়ক ও বিরক্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি করে। নিমপাতার পাউডার আপনাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিবে। নিমের এন্টিব্যাকটেরিয়াল পদার্থ মাথা খুশকি মুক্ত রাখতে কার্যকরী।

প্রথমে নিমের পাউডারের সামান্য পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এবার এটি চুলের গোড়ায় লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে দিন এবং তারপর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

ত্বকের সমস্যা দূরে রাখে

ত্বকের সমস্যা হলে সেটি সবার নজরেই আসে। ত্বকের যেকোনো সমস্যা সমাধানে নিমের পাউডার কাজে আসতে পারে। নিমপাতায় প্রচুর পরিমাণে এন্টিসেপটিক, এন্টিফাঙ্গাল, এন্টিঅক্সিডেন্ট,  এন্টিভায়রাল ও এন্টিফালামেটরি গুণ থাকে যা ত্বকের যেকোনো ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।

সাইনাসের সমস্যা সমাধানে

কমবেশি সবারই সাইনাসের সমস্যা রয়েছে। নিমপাতা সাইনাসের বিরুদ্ধে অনেক উপকারী। ১ চামচ নিমের পাউডার ১ কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন ২-৩ ফোঁটা করে গ্রহণ করতে পারেন। এতে আপনার উপকার হবে।

কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার

একে কীটনাশক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিমের পাউডার ও পানির মিশ্রণ গাছের গোড়ায়‌ ও পাতায় স্প্রে করলে তা কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

দাঁতের সুরক্ষা দেয়

দাঁতকে সুরক্ষা প্রদানে নিমের জুড়ি মেলা ভার। দাঁতের যত্নে  টুথপেস্টের সাথে সামান্য নিমপাতার পাউডার মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে দাঁতের ক্ষয়, মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া সহ নানা রকম সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়।‌অর্থাৎ বলা যায়, দাঁতের যত্নে নিমপাতা অত্যন্ত উপকারী।

নিম পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা
নিম পাতা



নিম পাতার রসের উপকারিতা

নিমপাতার রস আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী ও গুরুত্বপূর্ণ। নীচে এটির গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

কৃমিনাশক:

নিমপাতার রস একটি বহুল ব্যবহৃত কৃমিনাশক ঔষধ। আধুনিক কৃমিনাশক ওষুধ উদ্ভাবনের পূর্বে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে নিম পাতার রসই বেশি ব্যবহৃত হতো।

চোখের সমস্যার প্রতিকার:

কয়েকটি নিমপাতা গরম পানিতে সেদ্ধ করে নিতে হবে। এবার পানিটা ভালোভাবে ছেঁকে ঠান্ডা করে নিতে হবে। এখন চোখ চুলকানি বা চোখের বিভিন্ন প্রদাহ দূরীকরণে এটি ব্যবহার করা যাবে।

চর্মরোগ:

আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে নিমপাতা ও নিমপাতার রসে চর্মরোগ দূর করার গুণাগুণ রয়েছে। প্রতিদিন নিমপাতা দিয়ে গোসল করলে চর্মরোগ দূরে থাকবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে:

নিমপাতার রস কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সক্ষম। কয়েক ফোঁটা নিমের রস কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে ২ বেলা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।

ঠান্ডার সমস্যা প্রতিরোধে:

অনেকের মাঝে মাঝে বুকে কফ জমে বুকে ব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাদের জন্য ৩০ ফোঁটা নিমের রস সামান্য গরম পানিতে মিশিয়ে দিতে ৩/৪ বার খেলে এটি কমে যাবে। তবে গর্ভবতী মহিলা,শিশু ও বৃদ্ধদের এটি গ্রহণ না করাই ভালো।



নিম পাতার বড়ির উপকারিতা

নিম পাতার বড়ি হচ্ছে কোনো প্রকার পরিশ্রম ছাড়াই নিমপাতার উপকারিতা গ্রহণ করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। যেকেউ কোনো ইউনানী বা হোমিওপ্যাথি দোকান থেকে এটিকে ক্রয় করতে পারে। এছাড়াও সহজেই এটিকে বাসায় তৈরি করে ফেলা যায়। নীচে নিমপাতার বড়ি খাওয়ার কিছু উপকারিতা তুলে ধরা হলো:-

  • কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে।
  • এটি বসন্ত রোগ প্রতিরোধ করতে পারে।
  • নিম পাতার বড়ি খেলে পেপটিক ও ডিওডেনাল আলসারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
  • শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

নীচে এটি তৈরি করার পদ্ধতি সম্পর্কে দৃষ্টিপাত করা হলো:

যা যা প্রয়োজন:

✓নিম পাতা
✓২৫০ গ্রাম কাঁচা হলুদ
✓পানি

কার্যপদ্ধতি:

  • সর্বপ্রথম কয়েকটি নিমের পাতা ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
  • এরপর কাঁচা হলুদের খোসা ছাড়িয়ে পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • এখন নিমপাতা ও হলুদকে আলাদা আলাদা বা একত্রে ভালোভাবে পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে।
  • এই মিশ্রণটি থেকে ছোট ছোট অংশ দুই হাতের তালুতে নিয়ে ছোট ছোট বড়ি বানিয়ে নিন।
  • তবে খুব বেশী ছোট বানিয়ে ফেলবেন না। কারণ রোদে দিলে তা আরো ছোট হয়ে যাবে।
  • এবার সবগুলো বড়িকে রোদে শুকিয়ে ফেলতে হবে। মাঝে মাঝে বড়িগুলোকে উলোট-পালোট করে দিতে হবে।  
  • এভাবে ৪-৫ দিন শুকালেই বড়িগুলো খাবার উপযোগী হয়ে উঠবে।

নিম পাতার অপকারিতা

সকল ভালো জিনিসের যেমন অপকারিতা থাকে উপকারিতার পাশাপাশি, তেমনি নিম পাতারও রয়েছে কিছু অপকারিতা বা ক্ষতিকর দিক। আসুন জেনে নিই নিম পাতার অপকারিতা গুলো।

  • গর্ভবতী মহিলারা এই পাতা খাওয়া উচিৎ নয়। এটি খেলে গর্ভপাতের আশংকা থাকে।
  • শিশু বা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই পাতার তেল খাওয়া উচিৎ নয়। কারণ এটি খেলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, মস্তিষ্কের সমস্যা ইত্যাদি।
  • যাদের অটোইমিউন রোগ আছে তারা এই পাতা না খাওয়া ভালো। এতে ক্ষতি হতে পারে।
  • নিম্ন রক্তচাপ যাদের আছে তারা এই পাতা এড়িয়ে চলুন। কারণ নিম্ন রক্তচাপের ক্ষেত্রে নিম পাতা খেলে রক্তচাপ বেশি কমে যেতে পারে। ফলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
  • কোনো সার্জারি বা অপারেশন করানোর আগে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ এই পাতা না খাওয়া ভালো।
  • নিম পাতা বেশি খেলে নারীদের বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে।
  • খালি পেটে নিম পাতা বেশিদিন খাওয়া উচিৎ নয়। এতে ক্ষতি হয়।

নিমপাতা আমাদের সুস্থ জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিমগাছের এতো‌ যত্নের প্রয়োজন হয়না। তাই সহজেই এটিকে বাসার সামনে রোপনের মাধ্যমে এটির উপকারিতা গ্রহণ করা যায়। তবে পরিমিত পরিমাণে ও এর ক্ষতির দিকগুলো বিবেচনা করে তবেই এটি খাওয়া উচিৎ।

Sources:

https://www.medicalnewstoday.com/articles/325048
https://m.tarladalal.com/top-health-benefits-of-neem-leaves-259

আরও পড়ুন

ছাতু খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম।
আখরোট এর উপকারিতা।
করলা খাওয়ার উপকারিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

All Rights Reserved By Healthjus © 2021-2022