পনির খাওয়ার উপকারিতা ও পনির খাওয়ার নিয়ম

Food Habit General Queries

পনির বা Cheese বা চিজ আমাদের খুবই পরিচিত একটি দুগ্ধজাত খাবার। বিভিন্ন খাবারের সাথে আমরা এটি খেয়ে থাকি। পিজ্জা, বার্গার থেকে শুরু করে নিত্যদিনের রান্নায়ও অনেকে এটি ব্যবহার করে থাকেন। ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন সমৃদ্ধ এই খাদ্যটি আমাদের নানাবিধ স্বাস্থ্য উপকার করে থাকে। আজ আমরা এই দারুণ সুস্বাদু খাবারটি নিয়েই আলোচনা করবো।

পনির কি (চিজ/cheese)

পনির বা চিজ মূলত দুধ থেকে তৈরি একটি খাদ্য। এটি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। দুধ থেকে এটি প্রস্তুত করা হয়। দুধ কেটে ছানা তৈরি করার পর সেই ছানা থেকেই চিজ তৈরি করা হয়। দই যে প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় অনেকটা সে প্রক্রিয়ায়ই এটিও তৈরি হয়। এটির বাইরের দিকের অংশ ছাঁচের মতো হয়। চিজ বিভিন্ন প্রকারের হয়। দেশ বা অঞ্চলভেদে এর প্রায় এক হাজারের মতো প্রকারভেদ রয়েছে। মূলত এটি দেখতে হলুদ রং এর হয়। ভিটামিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ এই খাবারটি খেতে দারুণ। অনেকে এর সাথে মসলা যুক্ত করে রান্না করে খায়, অনেকে আবার লেবুর রস, ভিনেগার মিশিয়েও খায়, কেউ আবার মুখরোচক ফাস্টফুড কিংবা রান্নায় মিশিয়ে খায়। সুস্বাদু এই খাবারটির উপকারিতাও অনেক। আমাদের দেহের নানাবিধ স্বাস্থ্য উপকারে লাগে এটি।

পনির এর পুষ্টি উপাদান

পনির বা চিজে রয়েছে নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান। এতে বিভিন্ন পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেল যুক্ত ১০০ গ্রাম পনিরে রয়েছে:

  • ৫০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট।
  • ৫.১৭ গ্রাম প্রোটিন।
  • ৩৬২ কিলোক্যালরি শক্তি।
  • ১৮১ মিলিগ্রাম সোডিয়াম।
  • ৬৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম।
  • ৩৪ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল।
  • ৩.৪৫ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট।

পনির খাওয়ার উপকারিতা

পনির একটি পুষ্টিকর খাবার। এর নানা উপকারিতা রয়েছে তা আমরা ইতোমধ্যেই জেনে গেছি। কিন্তু কি কি উপকারিতা আছে এর? আসুন এবার জেনে নিই পনিরের কি কি উপকারিতা রয়েছে।

দাঁতের উপকারে চিজ বা পনির

চিজ একটি ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার। এটি দাঁতের জন্য খুবই উপকারী। এটি দাঁতকে শক্তিশালী করে তোলে। এছাড়াও চিজে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান দাঁতে থাকা রোগজীবাণুকে ধ্বংস করে। পাশাপাশি চিজ চিবানোর সময় এতে থাকা কিছু উপাদান মুখের পিএইচ (pH) মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে মুখেরও উপকার হয়।

ক্যান্সার প্রতিরোধে চিজ

পনিরে রয়েছে লিনোলিক এসিড এবং স্পিংহো লিপিড। এই দুটি উপাদান ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কতিপয় গবেষণা মতে, স্পিংহো লিপিড ও ক্যালসিয়াম কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে বেশ কার্যকর। এছাড়াও প্রায় সকল ধরনের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেই চিজ সাহায্য করে।

হাড় শক্ত করে

চিজ অতিমাত্রায় ক্যালসিয়াম যুক্ত হওয়ায় এটি স্বভাবতই হাড়কে শক্ত করে। এই খাবারে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিনের মতো উপাদান। এ সকল উপাদান শিশু, মহিলা, বয়স্ক মানুষসহ সকলেরই হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও এতে রয়েছে ভিটামিন-ডি। ভিটামিন-ডি ও ক্যালসিয়াম থাকায় হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় পনিরের ভূমিকা অনন্য।

ওজন বাড়ায়

প্রাকৃতিক ফ্যাট বেশি থাকায় চিজ ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। তবে প্রাকৃতিক ফ্যাটের পাশাপাশি এতে কম ফ্যাট যুক্ত  উপাদানও আছে যা দেহের ওজনের ভারসাম্যও ঠিক রাখে। ফলে ওজন বেশি বাড়েও না, আবার বেশি কমেও না।

অস্টিওপরোসিস নিরাময়ে পনির

অস্টিওপরোসিস হল হাড়ের রোগ। আর চিজে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি। তাই এটি খেলে হাড়ের উপকার হয় এবং অস্টিওপরোসিস রোগেরও নিরাময় হয়। শুধু অস্টিওপরোসিসই নয়, হাড়ের যেকোনো সমস্যাতেই চিজ বা পনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পনিরের উপকারিতা
চিজ বা পনির।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে

চিজ খেলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কারণ, শরীরে সোডিয়াম ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে গেলেই মূলত উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। কিন্তু চিজে সোডিয়ামের মাত্রা কম হওয়ায় এটি উচ্চ রক্তচাপ কমায়। পাশাপাশি এতে থাকা ভিটামিন-বি উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

গর্ভাবস্থায় পনির

গর্ভাবস্থায় পনির খাওয়া খুবই উপকারী। এটি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ায় গর্ভবতী নারীর ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণ করে। পাশাপাশি এটি গর্ভে থাকা ভ্রূণের গঠন ও বিকাশেও দারুণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও স্তন্যদানের সময় গর্ভবতী মায়ের জন্য যে পুষ্টির প্রয়োজন হয় তা এই চিজ পূরণ করতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় চিজ বা পনির খান। এতে বিশেষ উপকার পাবেন।

মেয়েদের পিরিয়ডের সময় পনির এর উপকারিতা

মেয়েদের পিরিয়ডের সময় বা পিরিয়ড শুরুর আগে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক ও মানসিক অবসাদ, হঠাৎ রাগ উঠা, মন খারাপ থাকা ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা পিরিয়ডের সময় দেখা দেয়। এ সকল সমস্যার জন্য দুধ জাতীয় খাবার বেশি খেতে বলেন চিকিৎসকরা। আর এক্ষেত্রে চিজ হতে পারে ভালো সমাধান। এটি যেমন এ সকল সমস্যা দূর করবে, তেমনি পিরিয়ডের সময় শরীরে পুষ্টিকর খাবারের চাহিদাও পূরণ করবে।

মাইগ্রেনের সমস্যায়

পনিরে রয়েছে ক্যাম্বার্ট জাতীয় এক ধরনের উপাদান যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি এই উপাদানটি মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। এই উপাদানটি  মস্তিষ্কের বিভিন্ন প্রদাহকে দূর করে। মস্তিষ্কের পেশির ফোলা কমিয়ে মাইগ্রেনের ব্যথাকে কমাতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কের সমস্যায় চিজ একটি অত্যন্ত উপকারী খাদ্য।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও চিজের রয়েছে দারুণ ভূমিকা। বিভিন্ন গবেষণার মতে, চিজ মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধে ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে৷ বয়স্ক মানুষদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে চিজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্যাপ্ত ঘুমে সাহায্য করে

দুধ জাতীয় যেকোনো খাবারই ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক। পনির বা চিজও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। এটি খেলে মস্তিষ্কের স্নায়ু স্থির হয়। ফলে ভালো ঘুম হয়। আর সুস্থ শরীরের জন্য ভালো ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। তাই দুধ খেতে সমস্যা হলে ঘুমের আগে দুধের পরিবর্তে চিজ বা পনির খেতে পারেন।

ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়

ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার হওয়ায় চিজ আমাদের ত্বককে ভেতর থেকে উজ্জ্বল ও শক্তিশালী করে তোলে। এছাড়াও সেলেনিয়াম নামক একটি উপাদান আমাদের ত্বকের ঔজ্জ্বল্যতা বাড়ায়। আর এই উপাদানের একটি উৎকৃষ্ট উৎস হল চিজ। তাই নিয়মিত চিজ খেলে আমাদের ত্বক উজ্জ্বল ও সুন্দর হয়।

চুলের সৌন্দর্যে

পনির একটি ভিটামিন-বি যুক্ত খাবার। আর আমাদের চুলের বৃদ্ধিতে ভিটামিন-বি হল খুবই উপকারী একটি উপাদান। তাই এটি খেলে চুলের বৃদ্ধি হয়। পাশাপাশি চিজে থাকা প্রাকৃতিক প্রোটিন চুলকে উজ্জ্বল ও সুন্দর করে। পাশাপাশি চুলকে মজবুতও করে।

পনির খাওয়ার নিয়ম

পনির খাওয়ার এমন কোনো নিয়ম নেই যেটা মেনে খেতে হবে। এটি বিভিন্ন ভাবে খাওয়া যায়। আসুন জেনে নিই পনির খাওয়ার কয়েকটি উপায়।

  • সালাদ হিসেবে চিজ খাওয়া যায় কিংবা কোনো রান্নার উপর ছড়িয়ে দিয়ে খাওয়া যায়।
  • পিজ্জার উপর ছড়িয়ে খাওয়া যায় চিজ। এক্ষেত্রে অবশ্য মোজারেলা চিজ বেশি ব্যবহৃত হয়।
  • মাংসের ফ্রাই বা ভাজির ভেতর চিজ দিয়ে ভাজি করে খাওয়া যায়।
  • বিভিন্ন ফলের রসের সাথেও অনেকে চিজ ব্যবহার করে থাকেন।
  • ডিম ভাজি বা অমলেটের মধ্যে এটি যুক্ত করেও খাওয়া যায়।
  • পাউরুটির সাথে চিজ খাওয়া যায়। চাইলে স্যান্ডউইচের সাথেও খাওয়া যায়।
  • বিভিন্ন ধরনের স্যুপ আমরা খেয়ে থাকি। এসব স্যুপের মধ্যেও এটি যোগ করে খাওয়া যায়।
  • শুধু চিজও ভেজে খেতে পারেন। তেলে ভেজে চিজ খাওয়া যায়।

যেভাবেই খান না কেন চিজ থেকে উপকারিতা পাবেন ঠিকই। তবে চিজ বা এ জাতীয় খাবার রাতের দিকে না খাওয়াই ভালো। রাতের দিকে খেলেও তা যেনো খুব বেশি পরিমাণে না খাওয়া হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিৎ।

পনির এর অপকারিতা বা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া

কোনো খাবারই অতিরিক্ত খাওয়া উচিৎ নয়। অতিরিক্ত খেলে এ থেকে উপকারিতার বদলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। পনিরও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। এটিও বেশি পরিমাণে খেলে বিভিন্ন অপকারিতা বা ক্ষতি দেখা দিতে পারে। এবার এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সমূহ জেনে নিই।

  • দুধ বা দুধ জাতীয় খাবারে অনেকের এলার্জি আছে। তারা চিজ বেশি খাবেন না বা এড়িয়ে চলবেন।
  • চিজ বেশি পরিমাণে খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি পেট ফোলা, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যাও হতে পারে।
  • চিজ মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করতে যেমন সাহায্য করে তেমনি এটি অতিরিক্ত খেলে মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
  • যারা মনোমিন  অক্সিডেস ইনহিবিটার জাতীয় ওষুধ খান তারা চিজ খাওয়া উচিৎ নয়। কারণ, এ জাতীয় ওষুধের সাথে বিষক্রিয়া করে চিজ মারাত্মক ক্ষতি সাধন করতে পারে।

চিজ বা পনির উপকারী খাবার। এর রয়েছে অনেক উপকারিতা তা আমরা জেনেছি। এ থেকে অসংখ্য উপকার পাওয়া যায়। তবে উপকার থাকলেও এটি পরিমিত পরিমাণেই খাওয়া উচিৎ। এই খাবারটি যেমন আমাদের খাদ্য তালিকায় বাড়তি স্বাদ যোগ করে, তেমনি অনেক দেহের অনেক উপকারও করে। তাই এ থেকে উপকারিতা পেতে হলে অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে পর্যাপ্ত চিজ বা পনির খেতে হবে। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন

নিমপাতা খাওয়ার উপকারিতা।
ছাতু খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম।
কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

All Rights Reserved By Healthjus © 2021-2022