মাথা ব্যথা – মাথা ব্যথার কারণ ও মাথা ব্যথা দূর করার উপায়

Health and Body

মাথা ব্যথা

মাথা ব্যথা আমাদের অতি পরিচিত একটি সমস্যা৷ এই সমস্যা প্রায়ই আমাদের অনেকের হয়ে থাকে। অল্প বিস্তর এই ব্যথা প্রায় সবারই হয়। তবে অল্প থেকে মারাত্মক আকারও ধারণ করে এই রোগ কখনো কখনো। আর ব্যথা বেড়ে প্রচন্ড আকার ধারণ করলে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। এই ব্যথাকে কখনোই হালকা ভাবে নেওয়া উচিৎ না। এটি একটি মারাত্মক সমস্যা। একে হালকা ভাবে নিলে তা থেকে বড় ধরনের কোনো গুরুতর সমস্যা হতে পারে যে অনেক বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

মাথা ব্যথার কারণ

মাথা ব্যথা প্রায়ই হয়। তবে এটি কি কারণে হয়? নানা কারণে এটি হতে পারে। মাইগ্রেন, ক্লান্তি বা অন্য কোনো সমস্যা থেকেও হতে পারে এই ব্যথা। আজ জানবো কি কি কারণে মাথাব্যথা হয়।

দুশ্চিন্তার কারণে

মাথা ব্যথার সবচেয়ে পরিচিত যেই কারণটি দেখা যায় সেটি হল মূলত দুশ্চিন্তার কারণে। অনেকে অনেক সময় নানা বিষয় নিয়ে নানা রকম দুশ্চিন্তা করে থাকেন। এ সকল দুশ্চিন্তা থেকে হতে পারে মাথাব্যথা।

দুশ্চিন্তাজনিত মাথাব্যথা সাধারণত অতটা তীব্র হয় না। সকালের দিকে এই ব্যথা তেমন না থাকলেও সময় গড়ানোর সাথে কিছুটা বাড়ে। এছাড়াও ক্লান্তি কিংবা কম ঘুম হলে বা অবসাদের কারণে এ সংক্রান্ত ব্যথা বাড়তে পারে।

মাইগ্রেনের কারণে

মাইগ্রেন হল সবচেয়ে তীব্রতর মাথা ব্যথার কারণ। মাইগ্রেনের সমস্যা থাকলে আপনার তীব্র মাথাব্যথা হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের এই সমস্যা থাকে। তবে ছেলেদের যে থাকে না এমন কিন্তু নয়। ছেলেদেরও হতে পারে মাইগ্রেনের সমস্যা।

মাইগ্রেনের ব্যথা সাধারণত মাথার যেকোনো একপাশেই হয়। এটি থেমে থেমে হয় এবং তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে সময়ের সাথে সাথে। হাতুড়ি দিয়ে কেউ পেটাচ্ছে মাথায় এমন অনুভূতি হয় এ ব্যথায়।

এ ব্যথা হাঁটা-চলা কিংবা শারীরিক পরিশ্রমে বেড়ে যায়। এমনকি আলোর নিচে থাকলেও এ ব্যথা বেড়ে যায়। তাই রোগী সাধারণত অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকলেই তার ভালো লাগে। এ ব্যথা যেমন কয়েক ঘন্টায় কমে যেতে পারে তেমনি ক্ষেত্র বিশেষে কয়েক দিনও লাগতে পারে।

ক্লাস্টার হেডেক

চোখের চারপাশে শুরু হয়ে মাথা পর্যন্ত এ ব্যথা হয়ে থাকে। এই মাথা ব্যথা হুট করেই শুরু হয়ে যায় এবং ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। মাইগ্রেনের মতো মাথার এক পাশে এ ব্যথা হয় এবং তা চোখের পিছনের দিকে ও চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

এই ক্লাস্টার হেডেক দিনে কয়েকবার হতে পারে এবং প্রতিবার ৫ থেকে ১০ মিনিট কিংবা ২ থেকে ৩ ঘন্টা পর্যন্ত থাকে। এই ব্যথার ফলে চোখের চারপাশ ফুলে যায়, চোখ লাল হয়ে যায়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে এমনকি চোখের দৃষ্টিতেও কিছু সমস্যা হয়।

দিন বা রাতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এই ব্যথা হয় বলেই এটি ক্লাস্টার হেডেক নামে পরিচিত। আলোতে এই ব্যথা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি গন্ধ ও কোনো শব্দেও এই ব্যথা বাড়তে পারে।

মাথা ব্যথা - মাথা ব্যথার কারণ ও মাথা ব্যথা দূর করার উপায়
মাথা ব্যথা

সেকেন্ডারি হেডেক

মানুষের ব্রেইনের বিভিন্ন সমস্যায় এ ধরনের ব্যথা হতে পারে। ব্রেইনের বিভিন্ন সমস্যা যেমন: ব্রেইনে টিউমার, ব্রেইনের রক্তনালীতে ইনফেকশন ইত্যাদির কারণে এই মাথা ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিৎ নয়। এই ব্যথা থেকে হতে পারে মারাত্মক সমস্যা।

সাইনাস

সাইনাস মূলত নাকের একটি অংশ। নাকের দুই পাশে থাকা হাড় ও কপালের হাড়ের মাঝে কিছু ফাঁকা ফাঁকা জায়গা থাকে। এগুলোই সাইনাস নামে পরিচিত। এই ফাঁকা জায়গাগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ভারের সমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর এই সাইনাসের আবরণে যখন কোনো প্রদাহ হয় তখন এতে বাতাস বা সর্দি জমে যায়। ফলে সাইনাসে ব্যথা হয়।

আর এই সাইনাসের ব্যথা থেকেই মাথায়ও ব্যথা শুরু হয়। আর এটিকেই সাইনোসাইটিস বা সাইনাস হেডেক বলে। এই ব্যথার কারণে সর্দি, কাশি কিংবা জ্বরের অনুভূতিও হতে পারে।

হরমোনাল হেডেক বা হরমোনের কারণে

মূলত মেয়েদেরই এই ব্যথা হয়। মাসিকের সময় বা এর আগে পরে মেয়েদের দেহে এস্ট্রোজেন হরমোনের তারতম্য হয়। ফলে এই ব্যথা হয়।

হরমোনের তারতম্যের কারণে হয় বলেই এই ধরনের মাথা ব্যথা হরমোনাল হেডেক নামে পরিচিত। গর্ভাবস্থায়ও নারীদের হরমোনের তারতম্য হয়। তখনও এই ধরনের মাথাব্যথা হতে পারে।

ক্রনিক ডেইলি হেডেক

প্রায় প্রতিদিনই চিন চিন করে এই ধরনের মাথা ব্যথা হয়। প্রতিদিনই হয় বলে এটি ক্রনিক ডেইলি হেডেক নামে পরিচিত। এই ধরনের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে দুশ্চিন্তা কমানো ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের বিকল্প নেই।

সেক্সুয়াল হেডেক

নাম শুনে অনেক অবাক হতে পারেন। কিন্তু সেক্সুয়াল কারণেও হতে পারে আপনার মাথা ব্যথা। স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলনের সময় কিংবা এর আগে বা পরে এ ধরনের মাথাব্যথা হয় বলে এটি সেক্সুয়াল হেডেক হিসেবে পরিচিত।

মূলত প্রচন্ড এক্সারশন বা উত্তেজনায় দেহের রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার কারণেই সেক্সুয়াল হেডেক দেখা দেয়। তবে এ ধরনের ব্যথা খুব বেশি হয় না এবং হলেও তা কমে যায় খুব দ্রুতই।

সাইকোজেনিক পেইন

অনেক সময় কোনো কারণ বা রোগ ছাড়াই মাথা ব্যথা হতে পারে। আর এ ধরণের ব্যথাই সাইকোজেনিক পেইন নামে পরিচিত। মূলত এটি একটি সাইকোলজিক্যাল বা মানসিক সমস্যা। মনস্তাত্ত্বিক কারণেই এই ধরণের মাথাব্যথা হয়ে থাকে। এই রোগের চিকিৎসা সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসকের মাধ্যমেই করানো উচিৎ।

এছাড়াও অনেক সময় চা, কফি না খাওয়া কিংবা অতিরিক্ত চা, কফি খাওয়া থেকেও মাথাব্যথা হতে পারে। তবে মাথাব্যথার কারণ যাই হোক এর যথাযথ চিকিৎসা এবং প্রতিকার খুবই জরুরী।

মাথা ব্যথা দূর করার উপায়

মাথা ব্যথার কারণ বিভিন্ন হতে পারে কিন্তু এর জন্য যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা না নিলে কিন্তু হতে পারে মারাত্মক সমস্যা। তাই মাথাব্যথা নিয়ে গাফিলতি না করে এটি দূর করার উপায় জানা দরকার। আসুন জেনে নিই এই ব্যথা দূর করার কিছু উপায়।

  • দুশ্চিন্তা থেকে মাথাব্যথা হলে ম্যাসাজ করেই এ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ঘাড়, মাথা এবং কপাল ম্যাসাজ করলে এ ব্যথা থেকে আরাম পাওয়া যায়।
  • মাথা ব্যথা হলে আলো থেকে দূরে থাকুন। আলোর কাছে থাকলে ব্যথা পারতে পারে। তাই সময় মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার এসব থেকে দূরে থাকুন এবং অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকুন।
  • বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখলে মাথাব্যথা কমে। কারণ, পায়ে গরম লাগলে বা তাপ লাগলে মস্তিষ্কের রক্তনালীর উপর বাড়তি চাপ কমে যায়। ফলে ব্যথা কমে যায়।
  • মাথাব্যথা হলে কপালে আর ঘাড়ে দিতে পারেন গরম সেঁক। এতে আরাম পাওয়া যায়।
  • ঠান্ডা বরফ পানিতে হাত ভিজিয়ে রাখলেও এই ব্যথা থেকে আরাম পাওয়া যায়।
  • এসেনশিয়াল অয়েল বা ল্যাভেন্ডারের মতো সুগন্ধি কপালে ও ঘাড়ে ম্যাসাজ করলে এ ধরণের ব্যথা থেকে আরাম পাওয়া যায়।
  • চা বা কফিতে আছে ক্যাফেইন। এই ক্যাফেইন মাথা ব্যথা কমাতে দারুণ কার্যকর। তাই চা বা কফি খেলে মুক্তি পেতে পারেন এই ব্যথা থেকে।

তবে এ সকল টোটকা বা উপায় আপনাকে মাথাব্যথা থেকে সাময়িক মুক্তি দিবে। কিন্তু মাথা ব্যথা যদি মারাত্মক কোনো সমস্যার কারণে হয়ে থাকে তাহলে এ ব্যথা সহজে কমে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

উপসংহার

আমাদের নিত্যদিনের সমস্যার একটি অংশ মাথা ব্যথা। একে নিয়ে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সাময়িক মুক্তি হয়তো বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসকের সাথে দ্রুত পরামর্শ করে সঠিক চিকিৎসা করানোই হতে পারে এই ব্যথার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

আরও পড়ুন

ওটস কি? কেন খাবেন?
রসুনের নানা উপকারিতা।
কলা খাওয়ার উপকারিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

All Rights Reserved By Healthjus © 2021-2022